বাংলাদেশ

কেন এমন কঠিন দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টাকে

বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কোন রাজনীতিকের কাছে যদি জানতে চাওয়া হয় উন্নয়ন শব্দের অর্থ কি? জবাবে বলা হবে গণতন্ত্র। বিতর্কিত সফল দুটি নির্বাচনের ওপর ভর করে আওয়ামী লীগের রাজনীতিকরা বাংলাদেশিদের একটি কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। তা হলো, জনগণ বিকল্প বেছে নিতে পারে। কিন্তু তাদের উচিত দেশকে দ্রুত উন্নয়নের দিকে নিয়ে যেতে চাইলে ক্ষমতাসীন দলকে সমর্থন দিতে হবে। ভারতের অনলাইন স্ক্রল ডট ইন-এ প্রকাশিত ‘ডেভেলপমেন্ট ওভার ডেমোক্রেসি’: হোয়াই বাংলাদেশজ ফরেন অ্যাফেয়ার্স এডভাইজর হ্যাজ সাচ এ ডিফিকাল্ট জব’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। এতে আরো বলা হয়েছে যে, এক দশকের বেশি সময়কালে আওয়ামী লীগের ধারাবাহিক তিন মেয়াদে উন্নয়নের উদাহরণের তালিকা তুলে ধরে জনসমাবেশে মাঝে মাঝে কিছু রাজনীতিক মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ অথবা সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান ইউ-এর কথা উল্লেখ করেন। এর মধ্য দিয়ে তারা জোর দিয়ে বলেন যে, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে উত্তম উপায় হলো অন্যদের ক্ষমতায় আনার পরিবর্তে তাদের দল দ্বারা পরিচালিত সরকারকে ক্ষমতায় অব্যাহত রাখা।

এতে ভুল কিছুই নেই।
গণতান্ত্রিক অধিকার আছে একটি রাজনৈতিক দলের। কিন্তু সমস্যাটা হলো কি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার বিরাট আকারে প্রশ্নবিদ্ধ মিডিয়ার কাছ থেকে সুবিধা পাচ্ছে। এই সরকার তার অর্জনের কথা বলতে মাস্টারে পরিণত হয়েছে। কিন্তু অস্বস্তিকর প্রশ্ন এলে তা গুলিয়ে ফেলে।

এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো গত ১০ই ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভীর ডয়েচে ভেলেকে দেয়া একটি সাক্ষাতকার। তার সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন আপসহীন বর্ষীয়ান সাংবাদিক টিম সেবাস্তিয়ান। প্রাণশক্তি কেড়ে নেয় এমন প্রশ্ন করার কারণে তিনি বিশ্বজুড়ে খ্যাতি পেয়েছেন।

গওহর রিজভীকে যেসব বিষয়ে প্রশ্ন করেছিলেন সেবাস্তিয়ান তার মধ্যে ছিল খেয়াল-খুশিমতো গ্রেপ্তার করা, নির্যাতন করা, জোরপূর্বক গুম করা এবং বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে। এসব বিষয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে জাতিসংঘ, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং কমিটি এগেইনস্ট টর্চার-এর মতো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন। এসব বিষয়ে প্রশ্নে বিনয়ী রিজভী তোতলালেন এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে স্বীকার করলেন যে, বর্ণিত অপরাধগুলোর কিছুটার জন্য দায়ী তার সরকার।

একাধিকবার গওহর রিজভী তার কথোপকথন শক্তিশালী ‘স্যুটের’ দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। সেটা হলো বাংলাদেশে যে উন্নয়নমূলক কাজ চলছে। কিন্তু তাকে থামিয়ে দেন সেবাস্তিয়ান। তিনি বললেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সফলতাকে অনুমোদন দিতে আপনি খুবই দক্ষ। কিন্তু আমি আপনাকে আসলে সে বিষয়ে প্রশ্ন করিনি। আপনার দেশে যেসব অন্যায় হয়েছে আমি সেসব বিষয়ে আপনার কাছে জানতে চেয়েছি।

প্রায় দু’বছর আগে গা শিউরানো একই রকম ঘটনা ঘটেছিল যখন ‘ইজ বাংলাদেশ এ ওয়ান-পার্টি স্টেট?’ (বাংলাদেশ কি একদলীয় রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে?) শীর্ষক আল জাজিরার একটি প্রোগ্রামে মেহেদি হাসান তার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। মেহেদি হাসান তার কাছে প্রশ্ন করেছিলেন বাংলাদেশে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং জোরপূর্বক গুমের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ইস্যুতে। এ ছাড়া তিনি ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন করেছিলেন, যে নির্বাচন নিয়ে নির্বাচনের আগেই সহিংসতা হয়েছে, বিরোধীদের বিরুদ্ধে দমনপীড়নের অভিযোগ আছে, ভোট জালিয়াতির বিস্তর রিপোর্ট আছে এবং নির্বাচনের দিন ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। মেহেদি হাসান জোরপূর্বক গুমের যে প্রামাণ্য তথ্য রেফারেন্স হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন তার জবাবে রিজভী বলেছেন, সরকারের যেহেতু গ্রেপ্তারের কর্তৃত্ব আছে, তাই মানুষজনকে গুম করার কোনো প্রয়োজনই পড়ে না। তিনি আরো যোগ করেন, যদি এমনটা হয়ে থাকে তাহলে সরকার তার তদন্ত করবে। তিনি পাল্টা বক্তব্যও দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, বাংলাদেশ একদলীয় রাষ্ট্র নয়। কারণ, এখানে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে।

কঠিন কাজ
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিনি ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক শাফকাত রাব্বী বলেন, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একজন বিরল ব্যক্তি রিজভী, যিনি বর্তমান সরকারে দায়িত্বে রয়েছেন। হার্ভার্ডের কেনেডি স্কুল অব গভর্নেন্স-এর সাবেক একজন ফ্যাকাল্টি হিসেবে তার জানা উচিত সুশাসনের অর্থ কি। তাকে নিয়োগকারীরা বাংলাদেশকে এখন উদ্ভট রকমের একদলীয় রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। এর পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে তিনি তার সারাজীবনের প্রশিক্ষণ এবং গণতান্ত্রিক সরকার বিষয়ের লেকচারগুলোকে বিপথে (ডিপ্রোগ্রাম) পরিচালিত করছেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি এটা করছেন, বিদেশী সাংবাদিকদের সঙ্গে মুখোমুখি লড়াই করতে গিয়ে।

তবে বিদেশি মিডিয়া মাথানত করেনি। তাদের সামনে বর্তমান বাংলাদেশি শাসকগোষ্ঠীর পক্ষ অবলম্বন করতে গিয়ে রিজভীকে কঠিন সময়ে পড়তে হয়েছে। রাব্বী বলেন, এর কারণ হলো, মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক অতলস্পর্শী রেকর্ড রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০০৯ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ৩১ শে জুলাই পর্যন্ত নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো জোরপূর্বক গুম করে দিয়েছে কমপক্ষে ৫৭২ জনকে। কিছু মানুষকে যদিও মুক্তি দেয়া হয়েছে, কিন্তু তাদেরকে দেখানো হয়েছে গ্রেপ্তার অথবা তাদেরকে পাওয়া গেছে মৃত অবস্থায়। এসব হত্যার জন্য দায়ী নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। তথাকথিত ক্রসফায়ারের নামে এসব হত্যা করা হয়েছে। অনেক মানুষ এখনও কোথায় আছেন তা জানাও যায়নি।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল রিপোর্ট করেছে যে, ২০১৮ সালের মে মাসে মাদকবিরোধী অভিযান এবং মাদকের কোনো গডফাদারকে ছাড়া হবে না, সরকারপ্রধানের এমন ঘোষণার পর বাংলাদেশে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠনগুলো ডকুমেন্ট হিসেবে বলেছে, শুধু ২০১৮ সালে হত্যা করা হয়েছে ৪৬৬ জনকে। ২০১৭ সালের তুলনায় এই সংখ্যা তিনগুণেরও বেশি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে কমপক্ষে ৩০০ মানুষকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়েছে। এর জন্য নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন সদস্যেরও বিচার হয়নি।

ব্যাপক নির্যাতনের অভিযোগ
কমিটি এগেইনস্ট টর্চার তার রিপোর্টে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে, স্বীকারোক্তি আদায় অথবা ঘুষ আদায়ের জন্য ব্যাপক এবং নিয়মিত নির্যাতন ও অশালীন আচরণ করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তারা। এসব মামলার তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশে ঘাটতি আছে। এ ছাড়া আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিশেষ করে র্যাষবের বিরুদ্ধে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করায় ব্যর্থতা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর ড. আলী রীয়াজ বলেন, অনেক সময় বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিরা প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এর কারণ, তারা অস্বস্তিকর সত্য এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তারা প্রশ্নের উত্তর দেয়ার পরিবর্তে ভিন্নখাতে নিয়ে যেতে চেষ্টা করেন। এর কারণ, বাস্তবতা তাদের বর্ণনা থেকে একেবারেই আলাদা। এছাড়াও তাদের অনেকেরই নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে সামান্যই প্রভাব আছে। তাই তারা সরকারি বিবৃতির বাইরে কিছু বলতে পারেন না।

অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক বাংলাদেশি লেখক ফাহম আবদুস সালাম আন্তর্জাতিক মিডিয়ার সামনে কঠিন প্রশ্নে রিজভী যে পারফর্মেন্স দেখিয়েছেন, তার বর্ণনা করেছেন এভাবে- এটা যা ঘটেছে তাতে মনে হয়েছে একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগে একজনই গওহর রিজভী আছেন, যাকে সরিয়ে দেয়া উচিত। আন্তর্জাতিক মিডিয়ার কাছে তিনি ন্যূনতম ‘উপস্থাপন অযোগ্য’। প্রত্যক্ষভাবে বলা যায়, তিনি ক্লুলেস। কিন্তু তিনি তার হার্ভার্ড/অক্সফোর্ডের পরিচয়কে ব্যবহার করে ক্ষমতাসীনদের সাফাই গান। হার্ভার্ডের সম্মানীত একজন শিক্ষাবিদের অবস্থান এবং একজন আওয়ামী লীগের প্রতি অনুগত হওয়ার মধ্যে অস্পষ্টতায় তিনি বেছে নিয়েছেন পরেরটা।

সম্পর্কিত

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

Back to top button