বিশ্ব

সিরিয়াকে কেন্দ্র করে এক হচ্ছে ইরান, রাশিয়া ও তুরস্ক

সিরিয়াকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চাইছে তুরস্ক, রাশিয়া এবং সম্প্রতি তাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়া ইরান। বর্তমানে তাদের মনযোগ সিরিয়া ও ইরাককেন্দ্রীক হলেও এই জোটের লক্ষ্য সুদূরপ্রসারী।
মূলত মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ দৃঢ় করতে জোটবদ্ধ ভাবে কাজ করছে ইরান, তুরস্ক ও রাশিয়া। সিরিয়া এবং ইরাকের সংঘাতমূলক পরিস্থিতির অবসান ও আইএসসহ ওই অঞ্চলে সক্রিয় অন্যান্য জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো দমনে ২০১৭ সাল থেকে রাশিয়া ও তুরস্ক যৌথভাবে কাজ শুরু করলেও তাদের চুড়ান্ত লক্ষ্য গোটা মধ্যপ্রাচ্যে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করা।
রাশিয়া ও তুরস্কের এই অভিযাত্রায় নতুন সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে যোগ দিয়েছেন ইরান। ইসরায়েলের জনপ্রিয় ইংরেজি পত্রিকা জেরুজালেম পোস্ট একটি বিস্তৃত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তিন দেশের সাম্প্রতিক মৈত্রীতাপূর্ণ সম্পর্কের বিষয়ে।
গত শুক্রবার এক সরকারি সফরে তুরস্ক গিয়েছিলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ। সেখানে তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলুর সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। বৈঠকে ইরানের বিভিন্ন অর্থনৈতিক খাতে বিনিয়োগ এবং রেলপথে দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে তুরস্ক।
তুরস্ক থেকে ফিরে এসে সফর সম্পর্কে ইরানের সাংবাদিকদের কাছে উচ্ছ্বা প্রকাশ করে জাভেদ জারিফ বলেন, ‘দ্বিপাক্ষিক এবং আঞ্চলিক ইস্যুতে একত্রে কাজ করার বিষয়ে খুবই ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে আমাদের মধ্যে। মেভলুত কাভুসোগলু আমার ভাইয়ের মতো। ইরান ও তুরস্ক—দুই রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্কের বয়স ৪০০ বছর। আমরা যদি একত্রে কাজ করি, তাহলে যে কোনো কঠিন লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।’
এদিকে সম্প্রতি বিমানবিধ্বংসী যুদ্ধযান এস-৪০০ ও বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম কিনতে সম্প্রতি রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করেছে তুরস্ক। তুরস্কের দৈনিক হুরিয়াৎ জানিয়েছে, তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং দেশটির শীর্ষ গোয়েন্দাসংস্থা হাকান ফেদানের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে স্বাক্ষরিত হয়েছে এই চুক্তি।
তবে তুরস্ক ও রাশিয়ার মধ্যে বর্তমানে যে কূটনৈতিক সম্পর্ক চলছে, তা স্পষ্টভাবে বুঝতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে অতি সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ‘বাকযুদ্ধ’ চলাকালে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের সাম্প্রতিক মন্তব্যে মনযোগ দেওয়া যেতে পারে।
সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ভ্লাদিমির পুতিনকে তিনি খুনি বলে মনে করেন কি না। উত্তরে সায় দিয়ে বাইডেন বলেন, যে তিনি পুতিনকে খুনি মনে করেন।
এরপরই তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান জো বাইডেনের এই কথার নিন্দা জানিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মুখে এ ধরনের কথা মানানসই নয়।
গত সপ্তাহে কাতারের রাজধানী দোহায় এক বৈঠকে মিলিত হন তুরস্ক, রাশিয়া এবং কাতার সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। বৈঠকের পর এক যৌথ বিবৃতিতে তিন দেশের সরকারী প্রতিনিধিরা বলেন, ‘সিরিয়ার আঞ্চলিক সমন্বয় রক্ষা ও দেশটিতে শান্তি ফিরিয়ে আনতে জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী একসঙ্গে কাজ করতে সম্মত হয়েছে তুরস্ক, রাশিয়া এবং দোহা।’
পরে এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায় ইরানও। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাঈদ খাতিবজাদেহ এক বার্তায় এই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বলেন, ‘সিরিয়ায় সংঘাতপূর্ণ অবস্থার অবসান করে স্থিতিশীলতা আনা ও সেই দেশের নাগরিকদের একটি নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে গ্রহণ করা যে কোনো আন্তর্জাতিক পদক্ষেপকে স্বাগত জানবে ইরান।’
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে চলতি শতকের প্রথম দশক পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে প্রায় একক নিয়ন্ত্রণ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। সৌদি আরব ও ইসরায়েল— দুই আঞ্চলিক মিত্রের সহযোগিতায় গোটা মধ্যপ্রাচ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের অধীনে।
সিরিয়া অবশ্য আগে থেকেই প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব বলয়ের মধ্যে ছিল, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক রাজনীতিতে দেশটির অবস্থান তেমন শক্তিশালী ছিল না তখন।
কিন্তু পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে যায় ২০১৩-১৪ সালে, যখন সিরিয়া এবং ইরাকে উত্থান ঘটে আইএসের। এই জঙ্গিগোষ্ঠী দমনে যখন মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনী সেখানে যুদ্ধ করছে, সেসময় ২০১৭ সালে কাজাখস্তানের রাজধানী আস্তানায় বৈঠক হয় তুরস্ক ও রাশিয়ার। বৈঠকের পর আইএস দমনে সিরিয়াতে সেনা অভিযান শুরু করে রাশিয়া। অন্যদিকে ইরাকে মার্কিনপন্থী কুর্দিস্তান ওয়ার্কাস পার্টি বা পিকেকের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে তুরস্ক।
পিকেকের সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক রয়েছে ইরানেরও। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে ইরান। ফলে বাণিজ্যিক সম্পর্ক শক্তিশালী করতে তুরস্কের সাম্প্রতিক প্রস্তাবকে ঘুরে দাঁড়ানোর ‘সুবর্ণ সুযোগ’ বলে মনে করছে দেশটি।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, বিভিন্ন কারণে গত কয়েক বছরে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রাধান্য হ্রাস পেয়েছে সৌদি আরবের। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও কিছুটা নড়বড়ে হয়েছে।
সূত্র: জেরুজালেম পোস্ট

সম্পর্কিত

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

Back to top button